Monday, July 16, 2012

মাধবকু-ের সাতকাহন


শাহীন আহমেদ
মাধবকু-। সারা এক প্রাণবন্ত জলঝর্ণার নাম। এর অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা থানার পাথারিয়া বনাঞ্চলে। ১৬২ ফুট উঁচু আদম আইল বা পাথারিয়া পাহাড় থেকে খাড়াভাবে অবিরাম জলপ্রপাতের ফলে সৃষ্ট কু--মাধবকু-। পাহাড়ি পল্লবে ঘেরা ঝিঝি পোকার গুঞ্জনে মুখরিত এ অবস্থানে জলরাশির অবিরাম ধারাপতনের শব্দে শান্তিতে ভরে যায় মন। যে ট্রিলার গা বেয়ে পানি পড়ছে তার পুরোটাই পাথুরে। তাছাড়া নিচে ছড়িয়ে আছে বিরাট পাথররাজি, যা দর্শনার্থীদের হৃদয় আকৃষ্ট করে। মাধবকু- এখন পর্যটন কেন্দ্র। আগে বছরে একবার পুন্যার্থীরা এলে এখানে মেলা বসত। এখন রোজই বসে মেলা। সারাদেশ থেকে রোক আসে। গড়ে উঠেছে অনেক দোকান পাঠ। কু-ে ভাসছে নৌকা। পাড়ে চড়ছে ঘোড়া। জায়গাটা এখন ফটো তোলার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। পর্যটনের পাকাবাড়ি উঠেছে। মানুষের হাত পড়েছে প্রকৃতির গায়ে। ছড়ানো বোল্ডারে নানাজনের নাম ঠিকানা লেখা। চড়–ইভাতির নিয়মিত শৌখিন সফর জায়গাটাকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করে তুলেছে। দূর থেকে মাধবকু-ের মূল স্পটকে অনেকটা গুহার মত মনে হয়। এখানে নির্ঝরের ঝরঝর, পত্র-পল্লবের মৃদুমর্মর, চেনা-অচেনা পাখির একটানা কুজন ঝর্ণার জলের সোদা সোদা গন্ধ। গাছের তলায় বসলে শীত শীত করে।

মাধবকু-ের ইতিহাস
কমলাকান্ডগুপ্তের হট্টনাথের পাঁচারীর ব্রহ্মাঞ্চল খ- থেকে ‘জনশক্তি’ নামক সাপ্তাহিক (অধুনালুপ্ত) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে উল্লেখ আছে-সিলেটের শেষ হিন্দু রাজা গঙ্গাধ্বজ পাথারিয়া পাহাড়ে একটি বিশ্রামাগার নির্মাণ শুরু করলে মাটির নিচে এক ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। তখন তিনি ওই সন্ন্যাসীর পদবন্দনা শুরু করেন। সন্ন্যাসী তাকে বলেন, মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশ তিথিতে ওই কু-ে তাকে যেন বিসর্জন দেওয়া হয়। রাজা সন্ন্যাসীর আজ্ঞা পালন করেন। তখন মাধব, মাধব, মাধব বলে তিনবার দৈবরাণী হয়। তা থেকে এর নামকরণ হয় মাধবকু-। কু-ের ডানপাশে পাথরের গায়ে একটি গুহার সৃষ্টি হয়েছে। গুহাটিকে স্থানীয় ভাষায় কাব বলা হয়। কাব দেখলে মনে হবে পাহাড়ের গায়ে কেউ যেন বহুযতেœ খোদাই করে রেখেছে পাথরের একটি চালাঘর। অথচ এটি প্রাকৃতিক। বৃষ্টির সময় এ কাব এর নিচে প্রায় দুশতাধিক লোক দাঁড়াতে পারবে। মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশ তিথিতে সআনার্থীরা কার্বের নিচে দাঁড়িয়ে ভেজা কাপড় পরিবর্তন করে থাকেন। কথিত আছে নাগবাবা নামের একজন সন্ন্যাসী স্বপ্নে দৃষ্ট হোন যে মাধবেশ্বর শিব তাকে বলছেন-‘আমি কু-ের মধ্যে শত শত বছর যাবত নিমজ্জিত আছি! আমাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা কর,’ তারপর নাগাবাবা সেই শিবলিঙ্গ ঝর্ণার ঠিক পেছনের উঁচু অংশে স্থাপন করেন এবং এটিই এখন শিব মন্দির নামে পরিচিত। এখন নিয়মিত পূজা অর্জনা চলে এখানে। মাধবকু-ের একটু দূরে শিবলিঙ্গ তীর্থের অবস্থান। মূলকু- থেকে অর্ধকিলোমিটার দূরে চৈত্রশুক্লা প্রতিপদে পূজারাীগণ পূজো করতে এখানে আসেন। প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে শিবলিঙ্গ তীর্থও একটি দর্শনীয় স্থান।

বাঘ সিংহ মন্দির
১৯৬৭ সালে বাঘ সিংহ মন্দির নির্মাণ করা হয়। এর নির্মিাতা কন্টইনাথ। এ মন্দিরের বারান্দায় একটি বাঘ ও একটি সিংহের প্রতিকৃতি আছে। মন্দিরের চৌকাঠে খোদাই করে লেখা আছে ‘ও নম : শিবায়। দাসো ওহং শবমাগত : করুনয়া বিশ্বেশ্বরপ্রাহি মাং।

আরো আছে কু-
মাধব কু- থেকে প্রায় এক মাইল উপরে রয়েছে আরো একটি ছোট কু- ও বৃহৎ পাথর খ-। সুবৃহৎ এই পাথর খ-টি ছড়ার এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত সমান স্থান জুড়ে আছে। দৃশ্য দেখতে হলে দর্শনার্থীদের কষ্ট করে উপরে উঠতে হবে।

আধ্যাত্মিক পুরুষ
পুরীবাবা
অতীতে মাধবকু- এলাকায় বেশ কয়েকজন গৃহত্যাগী সন্নাসী সাধনা করতে আসেন। এ সন্নাসীদের মধ্যে রামানন্দপুরী প্রাচীনতম। তিনি পুরী বাবা নামে পরিচিত ছিলেন। পুরী বাবা ১৩২০ বঙ্গাব্দে মাধবকু-ের গভীর বনে আসেন এবং কৃত্রিম শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা অর্জনা শুরু করেন। কথিত আছে মাধবকু-ের যেখান দিয়ে জল পড়ে সেখান দিয়ে তিনি খড়ম পায়ে যাওয়া আসা করতেন।

নাগাবাবা
পুরীবাবার মৃত্যুর পর নাগাবাবা নামের একজন সন্নাসী শিব পূজার দায়িত্ব নেন। তিনি এ কু-ের গভীর জঙ্গলের মধ্যে বাস করতেন।

চুড়া থেকে মাধবকু-
১৬২ ফুট উপর থেকে মাধবকু-ের ঝর্ণার জল পড়ে। পাহাড় বেয়ে সেই চুড়ায় পৌঁছানো সম্ভব। ওখান থেকে দেখা যায় আরেক দৃশ্য। মানুষগুলো যেন পুতুল, আর প্রমোদতরীটি যেন খেলনা। হাতি তার শুড় দিয়ে পানি ছিটালে যেমন দেখায়, জলপ্রপাতের পতনশীল পানিও যেনো তেমনি ছিটকে পড়ছে। মুষলধারায় বৃষ্টি হলে যেমন দেখায়, তার শতগুণ বেগে জলরাশি পড়ছে অহনিশি।

মাধবছড়া
মাধবকু-ের চোখের জলে একটি নদী বয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে একে ‘মাধবছড়া’ বলে। বর্ষায় কুল ছাপিয়ে বন্যার ঢল নামে। বৈশাখ মাসে থাকে হাটু জল। এই মাধবছড়া পশ্চিম দিকে হাকালুকি হাওরে গিয়ে মিশেছে।

বারুনী
চৈত্র মাসের মধুকুষ্ণা ত্রয়োদশ তিথিতে মাধবকু-ের বারুনী øান ও প্রায় দুই মাইল পশ্চিমে সনাতনপুরের বড়বন্দে ঐতিহ্যবাহী বারুনী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বারুনী উপলক্ষে এক সময় ভারতের হরিদ্বার লক্ষেèৗ, গয়া প্রভৃতি অঞ্চল থেকে সাধু-সন্নাসীরা আসতেন। এদের অনেকে ছিলেন দীর্ঘ জটাধারী। বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরাও আসতেন।

মৃত্যু
মাধবকু-ে অনেকের মৃত্যু ঘটেছে। ১৯৮৭ সালে বারুনী øানে এসে ১৫ বছর বয়সী হাইস্কুলের ছাত্র অসিতবরণ পালের মৃত্যু ঘটে। শত শত øানার্থীর ভীড়ে প্রায় হাঁটুজলে সে অন্তর্হিত হয়। এছাড়া বছর কয়েক আগে সিলেট মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্র নির্মমভাবে এখানে মৃত্যুবরণ করেন। তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ভেষজ ওষুধ
মাধবকু-ের পাহাড়ে বেড়ে ওঠা লতাপাতা ভেষজ ওষুধ হিসেবে খুবই উপকারী। কাটাকুটিতে এন্টিসেপটিক হিসেবে পিচাশ পাতা বা গাদা ফুলের রস, কচুর কস, পেটের যে কোন পীড়ায় ভাদালি, থানকুনি, পুদিনা রুপজট প্রভৃতি পাতার ঝোল, র্দি কাশিতে বাসক ও তুলসির রস, ব্যাথা পেলে আকন্দ পাতার গরম সেক, হাড় ভাঙলে হাড় জোড়া পাতার প্রলেপ। বাতের ব্যাথা বা ফোলায় ডনকলসের পাতার সঙ্গে লবণ ও চুন মিশিয়ে পিষে প্রলেপ দেওয়া, জ্বরে চিরতা বিভানো পানি, পেটের ব্যাথায় এক পাত্তির রস, কৃমি হলে নিমপাতার ভাজি বা রস, চর্ম রোগে নিম পাতা সিদ্ধ পানিতে øান-খুবই উপকারী। মাধবকু-ে এক সময় জনবসতি ছিল না। কু-ের চারদিকে ছিল ঘন অরণ্য। তারপর ধীরে ধীরে আসতে থাকে শিলং, ডাউকি, জৈন্তিয়া ও জাফলং থেকে অভিবাসিত আদিবাসী খাসিয়া, উড়িষ্যা ও বিহার থেকে আগত চা শ্রমিক কুলি। আর মনিপুর ছেড়ে আসে মুনিপুরী। এই নিয়েই মাধবকু-ের জনবসতি গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে লোকালয়। এই সব তথ্য জানালেন স্থানীয় এমদাদ, লুৎফুর ও আরেফ আহমেদ।

বদলে যাচ্ছে মধাবকু-
মাধবকু-ের পাথুরে সড়কে ইট বিছানো হয়েছে। পিচ পড়েছে। পর্যটকরা গাড়ি চালিয়ে সশব্দে মাধবকু-ে যাচ্ছেন। মাধবকু-ের পাখির কলরব ও বাতাসের আওয়াজ এখন নিশান পেট্টোল, পাজেরো, টয়েটা প্রভৃতি গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে প্রায় চাপা পড়ে যাচ্ছে। টেম্পুওয়ালারাও আছে। তারা টু-স্ট্রোক ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে ছাড়ছে ধোঁয়া। দালান উঠছে। দোকান বসেছে। সব কিছু বদলাচ্ছে। খাসিয়া কুলিরাও বদলে যাচ্ছে।

শেষ কথা
মাধবকু- যেমন দর্শনীয় স্থান, তেমনি একটি তীর্থস্থানও বটে। মাধবকু-ের ঘন অরণ্য কেটে সাফ করছে বনদস্যুদের দল। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্ধারিত হেফাজতকারীরা আছেন। কিন্তু তাদের সাধ্য নেই এ অপকর্ম ঠেকাবার। এ নিয়ে স্থানীয়দের আফসোসের শেষ নেই। স্থানীয় হরিপুরের বাসিন্দা কমান্ডার ইব্রাহিম আলীর ভাষায় তা ফুটে উঠল।

কিভাবে যাবেন
বাংলাদেশের যে কোন স্থান থেকে এখানে রেলপথ বা সড়কপথে আসার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে কুলাউড়া জংশন পর্যন্ত আসতে পারেন, কুলাউড়া থেকে সড়ক পথে মাধবকু-ে যাওয়ার জন্য রয়েছে প্রাইভেট গাড়ি ও বাস চলাচল করে। পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে জলপ্রপ্রাতের প্রায় আধামাইল পশ্চিমে রয়েছে একটি ডাকবাংলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানেও থাকা যায়। পর্যটন হোটেলে পাওয়া যায় রুচি সম্মত খাবার-দাবার।

বঙ্গোপসাগরে তিমি দেখার গল্প


শাহীন আহমেদ
TIMI;photo.M.R nomani
DOLPHIN:photo.M.R nomani
তারা আমাদের কোনো নিমন্ত্রণ জানায়নি। তবু আমরা এসেছি একবুক আশা নিয়ে। জীবন বাজী রেখে গভীর সমুদ্রে যদি দেখা পাই। ঘুরছি তো ঘুরছি। অগুনতি ডলফিনের তিড়িং বিড়িং নাচা-নাচি দেখতে দেখতে এক সময় বিরক্তি দেখা দেয় মনে- শরীরে। দুপুরের খাবার গ্রহণের পর সবাই বিরসবদনে, বেদনাবিধুর হয়ে, মলিন চেহারা নিয়ে বসে থাকি। অপেক্ষা বড় যন্ত্রণাদায়ক। মৃত্যুর চেয়ে কঠিন। অনেকের চোখে নামে রাজ্যির ঘুম। কারো চোখে তন্দ্রা, কারো ঝিমুনি আসে। হঠাৎ একসময় গাইড খোকন ভাই হাক দিয়ে বললেনÑ সবাই দেখুন। আমরা দেখলাম নীল জলরাশির মধ্যে কালোপাহাড়ের মতো ভোশ্শ করে কি যেনো একটা উঠলো, আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি জলজ্যান্ত তিমি। টেলিভিশনের স্ক্রিনে নয়। একেবারে চোখের সামনে। নিজের দেশে। বঙ্গোপসাগরে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে। সবাই আকাশ পাতাল চিৎকার করে উঠে। কেউবা নাচতে শুরু করে। ক্যামেরার ক্লিক পড়তে থাকে অহর্ণিশ। অনাকাক্সিক্ষত অতিথি দেখে তিমি ডুব মারে। ফের ওঠে প্রায় সাত মিনিট পর। একেবারে চোখের সামনে। আমরা আবার চিৎকার করে উঠি। এখানে দেখি প্রায় চারটি তিমি। যেনো একটি পরিবার। বিটিইএফ পরিবারের সঙ্গে তিমি দলের আন্তরিক মোলাকাতের পর দলনেতা আশরাফুল গনির চেহারায় ফুটে আলোর রুশনাই। ড. মনিরুল খান বললেন, যাক বাঁচলাম। এই বাঁচা মানে লজ্জার হাত থেকে বাঁচা। কারণ আমরা সবাই প্রিয়জনকে বলে এসেছি তিমি দেখতে যাচ্ছি। নিজেদের জলসীমায় তিমি দেখার গল্প নিয়ে এ বই। এবার খোলাসা করে বলি।বঙ্গোপসাগরের ভেতর একটি জায়গা রয়েছে গভীর খাদের মতো। বৃটিশ আমলে গবেষকরা এর কোনো কুল-কিনারা না পেয়ে নাম রেখে দেন সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড; বাংলায় অতল স্পর্শ। পাহাড়ে যেমন গিরিখাদ থাকে, এটিও ঠিক তেমনি। সাদা চোখে এই গভীর খাদ দেখা যায় না। তবে এখানে পৌঁছার একটু আগেই দেখা যায় নীল জলরাশি। দেখা যায় তিমি, কয়েক প্রজাতির ডলফিন, হাঙ্গরসহ বিচিত্র জাতের বড় বড় মাছ। আর জেলেরা তাদের বাশের হিসেবে ‘বাম’ অনুযায়ী কোনো হিসাব না পেয়ে নাম রাখেন ‘নাই বাম’। একবাম প্রায় পাঁচ ফুটের মতো। উল্লেখ্য, এটি বিশ্বের বড় ১১টি ক্যানিয়নের একটি। এর গভীরতা কোথাও কোথাও প্রায় ৯শ’ মিটার।


সাম্পানওয়ালা, ট্রলার ছাড়ো, পাল তোলো
দুই ফেব্র“য়ারি রাতের খাবারের পর দলনেতার ঘোষণাÑ বন্ধুরা আমাদের এক্সপেডিশন স্টার্ট। প্লিজ বি রেডি। লেটস গো। আমরা জিনিসপত্তর নিয়ে ট্রলারে চেপে বসি। সব ঠিকঠাক করে রাখা হয়। তেরপাল টাঙ্গানো হয়। ড্রামে পানি ভর্তি করা হয়। আমরা প্রস্তুত। কিন্তু ট্রলার চলবে না। কারণ খালে পানি কম। কাজেই অপেক্ষা করতে হবে জোয়ারের। জলাপেক্ষায় রাত বেড়ে ভোর হয় এখানে। এখানে এখন অনেক পানি। ছোট্ট এ খালে এতো পানি এলো কোথা থেকে। ভাবতেই অবাক লাগে। ট্রলার ভটভট শব্দ করে রওয়ানা দিয়েছে অজানার উদ্দেশ্যে। সকালের মিষ্টি বাতাস স্পর্শ করে আমরা চলছি। এরপর ট্রলার নামলো আন্ধারমানিক নদীতে। বিশাল এক নদী। নদীতে কিছুক্ষণ চলার পরই ট্রলার নামে সমুদ্রে।

ও সমুদ্র কাছে আসো, ভালোবাস
এখন আমরা সমুদ্রে, বঙ্গোপসাগরে। শীতের সকালের নরম রোদ, মিষ্টি বাতাস, সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ বেশ লাগছিলো। চলতে চলতে ডানে দেখতে পাই ফাতরার বন। তারপর অনেক দূরে দেখা যাচ্ছিলো সুন্দরবনের দুবলার চর। আমরা থেমে নেই। নোঙর নেই। ট্রলারের বিরতি নেই কোনো। চলছি তো চলছি। উপরে গনি ভাই, রবিন ভাই, জিলানি ভাই, ওয়াকিল ভাই, ফায়হাম, মনোয়ার, ট্রলারের সুকানি ও গাইডকে নিয়ে বসিয়েছেন আসর। সামনের খোলা পাটাতনে সামির ভাই, শাহরিয়ার ও শুক্কুর ভাইকে নিয়ে বসিয়েছে গানের আসর। সামির ভাই চমৎকারভাবে ঢোল, শাহরিয়ার করতাল বাজাচ্ছিলেন। কিছুটা দূর থেকে তন্ময় হয়ে তাদের গান শুনছেন রিফাত ভাই। শুক্কুর ভাই আজন্ম গায়ক। অনর্গল গান গেয়ে চলেছেন। তার আধ্যাত্মিক গানগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায় অনেকের। অবাক মুগ্ধ হয়ে শুনি শুক্কুর ভাইয়ের গান একটার পর একটা। ট্রলারের একেবারে সামনে গলুইধরে মশিউর ভাই, ফেরদৌস, আরিফ ভাই, মাহি, মনির ও রীপন মিলে চলছে নানান গল্প। ড. মৃদুল ও মেহেদি রাজীব আলাপে মগ্ন। কারণ তারা দু’জনেই শিক্ষক। শুধু ফটোগ্রাফার ইন্দ্রনীল কিশোর একা। বিশাল বস্তা খুলে ক্যামেরার ল্যান্স চেকে ব্যস্ত তিনি। রাজু আর নূরুল ভাই রান্নার আয়োজনে। আমাদের আনন্দযজ্ঞ চলছে। চলছে নানান বিষয়ে তর্কের তুফান। এভাবে চলতে চলতে এক সময় কাছে পিঠে আর কোনো ফিশিং ট্রলার নজরে আসে না। উপরে খোলা আকাশ, নিচে সমুদ্রের অথৈ জলরাশি। সমুদ্রের পানি বেশ স্বচ্ছ দেখাচ্ছে। ঢেউগুলোও অনেক বড়। ট্রলারে রোলিং হচ্ছে খুব। মনে হচ্ছে আমরা গভীর সাগরে আছি।

ম্যাপ, জিপিএস, ল্যাপটপ
এ কূল-কিনারাহীন সমুদ্রে আমরা আর কতো ভাসবো। আমাদের বুঝি কোনো মঞ্জিল নেই। টার্গেট নেই। না বন্ধু আছে। ঐ যে আগেই বলেছি- সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। রবিন ভাই’র সূত্রে পাওয়া যায় বিশেষ- বিশাল এক ম্যাপ। ড. মৃদুল, মশিউর ভাই ও রীপন গোল হয়ে বসেন। উপর থেকে আলোচনায় যুক্ত আছেন গণি ভাই। সঙ্গে গাইড খোকন ভাই ও মাঝি নুরু ভাই। তাদের আলাপের পর আমরা বুঝতে পারি নৌকা ঠিকই চলছে নির্দিষ্ট পথে। মশিউর ভাইর হাতে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) দেখে মাঝি নুরু ভাই বললেনÑ এয়া কি, কম্বিডার? এতো ছোডো কা? যখন তাকে বুঝানো হলো এই যন্ত্র দেখে আমরা ‘নাইবাম’ যাবো। পৃথিবীর সব বিস্ময়ে তিনি অজানা-অচেনা যন্ত্রটি ফের দেখেন। তার পয়ত্রিশ বছর নৌকাজীবনে তিনি এমন কথা কখনো শুনেননি এবং যন্ত্রটি এই প্রথম দেখলেন। তবে তার খোলা প্রশ্ন এত বড় দরিয়া আমরা ‘ছোডো’ এ ‘কম্বিডারে’ কীভাবে ঢুকালাম।

চুপ চুপ, ডলফিন
গাইড খোকন ভাইর চোখ সী-গাল পাখির মতো। কিন্তু আমরা সে চোখের ক্যারিশমা এখনো দেখতে পাইনি। তাকে বারবার প্রশ্নবানে বিরক্ত করছি। কই বস আপনার ডলফিন? কিছুইতো দেখছি না। সমুদ্রের অথৈ পাথারে শুধু পানি আর কতো দেখবো। কতো গল্প করবো, গাইবো গান? বিরক্তি ধরে গেছে। বেশি বিরক্ত সাব্বির ফেরদৌস। সে বরিশালের ছেলে। বললো, বরিশালের নদীতে এতোক্ষণে কয়েক হাজার ইরাবতি ডলফিন দেখা যেতো। সঙ্গী রাসেলও সায় দিলো। কিন্তু গাইড খোকন ভাই নিশ্চুপ। নির্ভেজাল দুশ্চিন্তামুক্ত। কারণ তিনি জানেন ডলফিন দেখা যাবেই। এবং আশ্চর্য দেখা গেলো ডলফিন। কিছুটা দুরে, তারপর আরো কাছে, অত:পর একদম কাছে। ট্রলারের লগেই। সেকি উচ্ছ্বাস, কিযে আনন্দ, কীভাবে যে বুঝাই।

বয়া কতদূর
বয়া হলো গভীর সমুদ্রে ফিশিং ট্রলারদের রাত্রি যাপনের নির্দিষ্ট স্থান। এটি মার্কিং করা আছে। কাজেই ফিশিং ট্রলার সারাদিন মাছ ধরে রাতে এখানে চলে আসে। এবারও মশিউর ভাইয়ের ডাক পড়লো। বয়া কতদূর! তিনি জিপিএস বাম হাতে ধরে, ডান হাত তুলে কোনো শব্দ না করে নির্দেশ দিলেন ডানে। ট্রলার চলতে থাকলো। এক সময় আমরা পৌঁছে গেলাম বয়াতে। দেখলাম অনেক ফিশিং ট্রলার নোঙর করে আছে। আমরাও ট্রলার অ্যাংকর করলাম। প্রায় পঞ্চাশ মিটার পানির ওপর। উল্লেখ্য, বয়া থেকে পশ্চিমে কিছুটা দূরে (ট্রলারে গেলে ঘণ্টা দেড়েকের পথ) পানির নিচে দুটি পাহাড় আছে বলে জানিয়েছেন গাইড খোকন ভাই।

ও গানওয়ালা, আসর বসাও
যেকোনো ট্রিপে ওয়াকিল ভাই মিস করলে গণি ভাই গান গেয়ে সে অপূর্ণতা পূর্ণ করেন। কিন্তু এবার ওয়াকিল ভাই এসেছেন। কাজেই পরিবেশ ভিন্ন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মিস্ত্রি শুক্কুর ভাই ও মাঝির সহযোগী মনিরুল ভাই। কি যে অসাধারণ তাদের গানের গলা। গানের তালে চমৎকার ঢোল বাজাচ্ছিলেন রবিন ভাই। তার এ প্রতিভার খবর বিটিইএফ পরিবারের জানা ছিলো না। তালে তালে করতাল বাজাচ্ছিলো শাহরিয়ার। খঞ্জনি ওয়াকিল ভাইর হাতে। মনিরুল ও শুক্কুর ভাইর গানের জোয়ারে ভাসতে থাকে সবাই। এতো গান এদের স্টকে বলে বুঝানো মুশকিল। চাইলে গান গেয়ে রাতের পর রাত তারা পার করতে পারবেন। লালন, হাছন, রাধারমন, বাউল করিম, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতিসহ কতো গান যে চলছিলো আসরে। এমনকি মিলা ইসলামের ডিসকোবান্দরও বাদ যায়নি। আসরে অনেকে টিনের প্লেট এমনকি গ্লাস দিয়ে টুংটাং শব্দ করে তাদের স্বরব মিউজিক্যাল উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলেন।

এক কাপ চা, একটি মধুর সকাল
আজকের সাগর-সকালে সূর্য উঠেছে আলোঝলমলে। বাতাসটাও মায়ামাখা। চারদিকে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ। বড় ভালো লাগছে। শুভ সকাল জানিয়ে কাছে এসে বসলেন রাসেল। ট্রলারের গলুইতে বসা আমরা দু’জন। তারপর কিন্তু আর বসবার কোনো জায়গা নেই। ইতোমধ্যে সবাই উঠে পড়েছে। প্রস্তুত ক্যামেরাবাহিনী। আমরা আজই প্রথম সোয়াচে যাবো। এখন শুধুই অপেক্ষা। কবে দেখা মিলবে নীলবসনা সোয়াচের। এমন সময়ে সকালের প্রাক নাস্তার জন্যে বিস্কিট-টোস্ট দেয়া হচ্ছিলো। মনে মনে ভাবছি যদি কেউ এক কাপ চা নিয়ে আসতো। বড় ভাল লাগতো। ভাবতে না ভাবতেই দেখি রাজু মার্মা চা নিয়ে হাজির। কিযে ভালো লেগেছিলো তখন। ধন্যবাদ রাজু।

দেখো সোয়াচ ঐ, স্বপ্নভূমি ঐ
আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো। মিষ্টি হাওয়া বইছে। বাতাসের কারণে রোদের তাপ খুব একটা অনুভূত হচ্ছে না। এখানে শুধুই আমরা। একেবারে একলা। এদিকটাতে মাছ ধরার কোনো ট্রলার নেই। হঠাৎ গাইড খোকন ভাই বললেন- দেখেন ঐ যে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। আমরা নড়েচড়ে বসলাম। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে এক জায়গায় সমুদ্র দু’ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে খোলা পানি। অন্যদিকে ডার্ক ব্লু। ঘন নীল। আস্তে আস্তে আমরা একেবারে সোয়াচের কাছে চলে আসি এবং ঢুকে পড়ি সোয়াচে। পানি এতো সুন্দর হয়! আমরা মোহমুগ্ধ হয়ে দেখি। পানি স্পর্শ করি। বড় শান্তি লাগে। মন গেয়ে ওঠে ওরে নীল দরিয়া...। নিজের দেশে এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য আছে দেখে অপার আনন্দে উত্তেজিত হতে থাকি। এই আত্মতুষ্টির বর্ণনা দেয়া মুশকিল।

পাখি তোর দেশ কই
এই একলা সমুদ্রে আমাদের সঙ্গী হিসেবে অগুনতি সী-গাল পাখি। ডানা মেলে শূন্যে ওড়াউড়ির দৃশ্য খুব হৃদয়গ্রাহী। মন বলে ওঠে আচ্ছা পাখির মতো যদি এভাবে উড়তে পারতাম। তারপর আবার ভাবছি, পাখিগুলোর বাড়ি কই, দেশ কই! এরা এই সমুদ্রে ঘুমায় কোথায়? কিন্তু দেখলাম পাখিগুলো ওড়াউড়ি ছাড়াও পানিতে নামে হাসের মতো। জলকেলি করে। ডুব মারে। মাছ ধরে। এসব খন্ডদৃশ্য দেখতে বেশ লাগছিলো। এইসব সী-গাল পাখি অনেক প্রজাতির হয়ে থাকে। আমরা চার প্রজাতির সী-গাল দেখেছি।

ঐ ডলফিন যা ভাগ
সোয়াচের ঘন নীল জলরাশিতে ডলফিন প্রথমে একটি, দুটি পরে দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরছে। যেদিকে তাকাচ্ছি এখন শুধুই ডলফিন। যেনো আমরা এসেছি কোনো এক ডলফিন রাজ্যে। কিছু কিছু ডলফিন পানির নিচ থেকে উঠে উঠে লাফ দিচ্ছিলো। এ যেনো তাদের জলনৃত্য। প্রথম প্রথম দেখতে খুব ভালো লাগছিলো। মজাও পাচ্ছিলাম বেশ। কিন্তু আর কতো দেখবো। কারণ এখনো তিমির দেখা নাই। যার জন্যে এসেছি বিপুল আশা ও উৎসাহ নিয়ে। এ কারণে ডলফিন সাম্রাজ্যে এদের লম্ফ-ঝম্ফ আর ভাল্লাগছিলোনা। তাই কেউ একজন রাগ করে বললেন- যা ভাগ।

...?
কি? কী! জানতে ইচ্ছে করছে তাই না? তিমি। তিমিরে ভাই। একদম চোখের সামনে। অবিশ্বাস্য। সবার চিৎকার আর আনন্দধ্বনি সে এক উল্লাস নৃত্য। ও গড। ইয়া আল্লাহ! তিমি দেখে ফেলেছি। শুরুতেই লিখেছি, সারাদিন আমরা সোয়াচে মাইলের পর মাইল ঘুরছি। শেষ বিকেল পর্যন্ত খুব হতাশ সবাই। মেহেদি আশাহত হয়ে বলছে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কী বলবো। ড. মৃদুলেরও একই অবস্থা। কারণ, তারা দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা সবাই প্রিয়জনকে বলে এসেছি তিমি দেখতে যাচ্ছি। না দেখতে পারলে লজ্জার শেষ থাকবে না। গাইড খোকন ভাইকে অনেকে দু’কথাও শুনিয়ে দিচ্ছিল। শেষ বিকেলে মনোকষ্টে অনেকে তন্দ্রামগ্ন হয়ে পড়ে। আকস্মিক গাইড খোকন ভাইর হাকডাকে জেগে উঠে দেখে মহাবিস্ময়। প্রথমে ভোশ্ করে ওঠে। পরে আবার ওঠে। পরে আবার। একদম চোখের সামনে। ক্যামেরার খটাশ খটাশ শব্দ ও আমাদের গগণবিধারী উল্লাসধ্বনি দেখার মতো দৃশ্য ছিলো। সবার চোখেমুখে প্রশান্তি। উল্লেখ্য আমরা এখানে দেখেছি চারটি তিমি। এরা ব্রডাস (ইৎুফব’ং ডযধষব- ঢ়ৎড়হড়ঁহপবফ “নৎড়ড়ফঁং”) প্রজাতির। জানালেন প্রাণীবিদ ড. মনিরুল খান। এছাড়া এখানে ‘ফিন’ ও ‘সেই’ প্রজাতির তিমি দেখা যায়।

তৃতীয় দিবস, আয় যাইগা
এবারের এক্সপেডিশনের আজ শেষ দিন। সাত-সকালেই আমরা ফের ছুটি সোয়াচের দিকে। যদি আজ অন্য প্রজাতির আরো তিমি দেখতে পাই এমন আশায়। অনেক চক্করের পর অবাক করে দিয়ে একটি তিমি তার উপস্থিতি জানান দেয়। আমরা দীর্ঘক্ষণ তার পেছন ছাড়িনা। এক সময় দলনেতার ঘোষণাÑ ‘বন্ধুরা সময়ের শাসন মানতে হবে। আমরা এখন ফিরে যাবো মাটির টানে, ঢাকায়।’ তবে নিশ্চিত অনেকের মন আসতে চাইছিলো না।

কতদূর তুমি গিয়েছিলে সখা
প্রশ্ন আসতে পারে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড কতদূর? কুয়াকাটা থেকে প্রায় নব্বই কিলোমিটার। সুন্দরবনের দুবলার চর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কি.মি.। কক্সবাজার থেকে দুশো পঞ্চাশ কি.মি.। আমরা মোট তিনশো পঞ্চাশ কি.মি. জলপথ ভ্রমণ করেছি।

একটি টিপস
সোয়াচে যাবার পর যখন দেখবেন সী-গাল পাখি নিচে নির্দিষ্ট জায়গায় বার বার চক্কর দিচ্ছে, তখন ধরে নিতে হবে এখানে ডলফিন আছে। যখন উঁচুতে সী-গাল উড়বে তখন ধরে নিন তিমি এখানে আছেই। অভিজ্ঞতা থেকে বলা। সম্ভাবনার কথা লিখছি।
 

শুকতারা মোহমুগ্ধতার গল্প

শাহীন আহমেদ
এখন বর্ষাকাল। আকাশের কান্নারা দলবেঁধে প্রতিদিন নামছে মাটির বুকে। বৃষ্টির জলে প্রাণ পেয়েছে প্রকৃতি। সবুজ হয়ে উঠেছে বৃক্ষজগৎ। এমন সময় নাগরিক অনেকের মনে স্বপ্নেরা উঁকি দেয়, আহা যদি সবুজের মাঝে, বৃষ্টির বর্ষিত রাতে, গ্রামের কোনো টিনের ছাদের বাড়িতে রাত কাটাতে পারতাম- স্বপ্নময় রাত। পাঠক, হতাশার কিছু নেই। ব্যবস্থা করে রেখেছে -শুকতারা রিসোর্ট। রিসোর্টের অবস্থান সিলেট শহর থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার দূরে। শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার গেইট থেকে একটু এগিয়ে বামে মোড় নিয়ে মিনিট দুই এগোলেই মিলবে কাংঙ্খিত শুকতারা। শহরের এতো কাছে নিবিড় বনের পাহাড়ী অবস্থান আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর চারদিকের সবুজ গাছপালা আপনাকে ডাকবে- আয় আয়। টিলার খাড়াপথে একটু কষ্ট করে উপরে উঠতে হবে। তবে ভয়ের কিছু নেই। কয়েকদিন বাদেই চালু হবে ট্রেন। উপরে উঠে প্রথমেই চোখে পড়বে তিন তলা বিশিষ্ট একাশিয়া রেস্টুরেন্ট। দ্বিতীয় তলায় খাবারের আয়োজন। পাশে একটা রুমে প্রায় ৪০ জনের মিটিং রুম। তৃতীয় তলায় বসবার, আলাপচারিতার। পাশে একটি রুম জুড়ে পাঠাগার। সিলেটের স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভ্রমণের বই আছে। নিচতলায় গায়ে হলুদ, কর্পোরেট মিটিং বা যেকোনো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যাবে। প্রতিটি তলায় আছে নান্দনিকতা ও পর্যাপ্ত আলো - বাতাসের ব্যবস্থা। আছে ব্যালকনি। মুক্ত হওয়া গ্রহণের উত্তম আয়োজন। আসুন এবার একটু উপরে উঠি। একাশিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে হবে উজান পথে। পূবের রাস্তা ধরে। ওখানেই আপনার বিশ্রাম নিবাস। থাকবার রুম। উপরে উঠেই চোখে পড়বে খোলা মঞ্চের মতো জায়গা। বনাক কোর্ট। এইবার আপনি দিশেহারা হবেন অপার মুগ্ধতায়। যে দিকেই তাকাবেন সবুজের হাতছানি। দূরে সুরমা নদী। তার পর সারিবাঁধা আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। মেঘালয় রেইঞ্জ। এখানে শরতে আকাশ রূপ খোলে নিজ আনন্দে। সে এক মাতাল করা দৃশ্য। আসুন রুমে ঢুকি। রুমে ঢুকেই দেখা মিলবে অন্যরকম মুগ্ধতার। রুমের সবকিছুতেই আছে শিল্পের ছোঁয়া। বেতের তৈরি চেয়ার, টেবিল, খাট, মোড়া। খোলামেলা রুম। খোলা বারান্দা। চাইলে রুমে বসেই দেখতে পারেন পাহাড় আর সবুজের মিতালি। বারান্দার উপরে টিনের চাল। বৃষ্টি মুখর রাতে প্রিয়জন সঙ্গী করে আপনার অবস্থান হবে স্মৃতিময়। রুমের ছাদে বসে ও উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতি সুধারূপ। রিসোর্টের নান্দনিক কিছু শিল্পকর্মের কাজ করেছেন নন্দিত ভাষ্কর অলক রায়। আছে ইয়াং স্টারের কিছু পেইন্টিং আর আলোকচিত্র। রিসোর্টে অবস্থানকালীন রাতে থাকবে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বাউল সঙ্গীত। মণিপুরী নৃত্য। খাবারের পাতে থাকবে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার। বেড়ানোর জন্যেও খুব দূরে যেতে হবে না। পাশেই খাদিম, বরজান চা বাগান, শাহ বদর মোকাম, খাদিম জাতীয় উদ্যান, টিলাগড়ে রিজার্ভ ফরেস্ট, শাহ পরাণ, শাহজালাল (রহ.) এর মাজার। সোয়াম্প ফরেস্ট। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, জৈন্তা রাজবাড়ি, সারি নদী, লালাখাল। একটু দূরে মাধবকু- জলপ্রপাত, টাঙ্গুয়া হাওর, হাকালুকি হাওর, লাউয়াছড়া ফরেস্ট আরো কতো কি। সিলেটের দেখবার আছে অনেক কিছু। আপনি চাইলে উত্তম গাইড দিয়ে দেখাবার  ব্যবস্থাও রেখেছে শুকতারা। শুকতারা এই নান্দনিক আয়োজনের কারিগর জেরিনা হোসেন। নিজেই আর্কিটেক্ট। স্বামী মোহাম্মদ হোসেন মুরাদ বিশ্ব ট্রাভেলার। দু’জনে স্বপ্ন দিয়ে বুনেছেন এই নকশিকাঁথা-শুকতারা। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু। আসছে রোজার শেষেই আনুষ্ঠানিক ওপেন হবে এর ফটক। তবে আপনি চাইলে এখনই থাকতে পারেন। মুরাদ-জেরিনার রিসোর্ট নিয়ে আছে আরো অনেক চমক। প্রজেক্টটি সম্পূর্ণ হলে দেশবাসী পাবে চমৎকার একটি রিসোর্ট। যোগাযোগ- ০৮২১-২৮৭০৯৯৪-৫,০১৭৬৪-৫৪৩৫৩৫। www.shuktararesort.com
photo.mustafiz mamun