Saturday, July 28, 2012

রামাদং

chobi.mahi uddi.BTEF

chobi.moon.BTEF
শাহীন আহমেদ
পাহাড়ের পর পাহাড়। আবার পাহাড়। আমরা দল বেঁধে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে ঘামি। ঘেমে নেয়ে উঠে একাকার। তেতো হয়ে ওঠা সূর্য মাথার উপর যেন লেপ্টে আছে। গরমে শরীর জ্বলতে থাকে। তারপরও আমরা হাঁটি। রামাদং যেতেই হবে। পার্বত্য বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড় রামাদং। এখানে পৌঁছতে এখনও প্রায় দিনের অর্ধেক সময় লেগে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে মিষ্টি বাতাস পেয়ে একটু জিরিয়ে নিই। জলযোগ করি। ফের হাঁটা শুরু করি। দ্রুত। সন্ধ্যার আগেই পৌঁছতে হবে। চারদিকে অবাক করা দৃশ্য! কোনো পাহাড় আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটি আবার কাত হয়ে আরামে ঘুমোচ্ছে। তাকিয়ে দেখেছি ছোট-বড় হাজার ধরনের গাছ। বাঁশঝাড়, অজস্র জাতের লতা, বিশাল পাথর, বুনো রামকলার ঝোপ। আর দেখেছি কতো জাতের ফুল! পাহাড়ি ঝিরিতে দেখেছি শান্ত-øিগ্ধ জল।
আমরা ঢাকার ফকিরাপুল থেকে এস. আলমে চেপে বসি। অসংখ্য বাসের কাটাকুটি খেলা এবং আকাশের নক্ষত্র গুনতে গুনতে ভোরবেলা পৌঁছে যাই বান্দরবান। চমৎকার একটি শহর! চারদিক আকাশ ছোঁয়া সব পাহাড়। মাঝখানে শহর। সকালের নাস্তা সেরে রোয়াংছড়ি যাবার জন্যে চাঁন্দের গাড়িতে উঠে বসি। গাড়ি একটু সামনে যেতেই একদল পুলিশ আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলো। তাদের বক্তব্য, রোয়াংছড়ি মেলার জন্য এ গাড়ি রিক্যুইজিশন করা আছে। আমাদের তর্কের তুফানেও তারা হাল ছাড়েন না। পরে একটা ট্রাকে তুলে দেন। আমরা নিরুপায়। রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে ট্রাকে উঠে দাঁড়াই। কিন্তু গাড়ি চলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কলজে, নাড়িভুঁড়ি সব নড়তে লাগলো। ঝাঁকির পর ঝাঁকি। ঝাঁকি খেতে খেতে ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছে যাই রোয়াংছড়ি স্কুলে। পায়ে হেঁটে বাজারে যাই।
প্রবীরদা চলে আসেন। আমাদের মাঠে নিয়ে যান। মাঠে দু’দিন ধরে চলছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান। পুরো বান্দরবান জেলার এমনকি বিদেশ থেকে এসেছেন অনেকে। অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা বসেছে। জেলার বয়োজ্যেষ্ঠ বিহারাধ্যক্ষ শ্রীমৎ উসারা মহাস্তবির আশি বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর শেষকৃত্য সসম্মানেই এ আয়োজন।
সন্ধ্যায় শুরু হয় বাজি পোড়ানো। বেশক’টি ছোট ছোট মন্দির। বড় একটি মন্দিরে শায়িত আছেন প্রয়াত উসারা। এ মন্দিরকে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তারের মাধ্যমে বেশ দূর থেকে বাতি  জ্বালিয়ে দিলে ক্ষীপ্র গতিতে গিয়ে পড়ে মন্দিরে। এভাবেই তাঁকে দাহ করা হয়। এটাই নিয়ম। পুণ্যার্থীরা ইহকালীন কল্যাণ ও পুনর্জন্ম যাতে মঙ্গলময় হয়, এজন্যে বাজি মানত করেন। প্রতিটি বাজি একশ’ পঞ্চাশ টাকা। মন্দিরের নির্ধারিত ভিক্ষুদের কাছ থেকে কিনে নিতে হয় এ বাজি। একে একে বাজি পোড়াতে থাকলে এক সময় মন্দিরে আগুন ধরে যায়। তারপর আগুনের লেলিহান শিখা আকাশের দিকে ধাবিত হয়। সমবেত মানুষের প্রার্থনা ও কান্নার দৃশ্য বড়ই হৃদয়গ্রাহী! এভাবেই মহামতি উসারার শেষকৃত্য সমাপ্তি হয়ে যায়।
রাতে মোরগ জবাই করে খাবারের আয়োজন করা হয়। মশলা ও ঝাল বেশি। ইতোমধ্যে পরিচয় হয় স্থানীয় শিশির তংচঙ্গ্যা ও বিশ্বনাথ তংচঙ্গ্যার সাথে। শিশিরদা চমৎকার হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মানুষ। রাতে তাদের ক্লাবে ঘুমাই। তিনি সবার জন্যে চাদরের ব্যবস্থা করে দিলেন। বাঁশের তৈরি ক্লাব ঘরটি খুবই সুন্দর। পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দিত। ভোরে আমরা উঠবার আগেই শিশিরদা তার দলবল নিয়ে হাজির।
সকালের নাস্তা শেষ করেই আবার যাত্রা শুরু করি। গন্তব্য রামাদং। প্রথমেই পাই বাঘছড়ি ঝিরি। ঝিরির জলে শব্দ করে হাঁটতে থাকি। মাইল তিনেক এভাবেই হাঁটি। পরে শুরু হয় তুলাতুলি পাহাড়। রিজার্ভ ফরেস্ট। প্রথম পাহাড়ে উঠতে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠে। একটু জিরিয়ে নেয়াতে ক্লান্তি দূর হলো।
আবার যাত্রা শুরু। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আবার ক্লান্তি। রালখাং পাড়ায় জল পান করি। ফের হাঁটা। ঘণ্টাদুয়েক পর আসি পাইখ্যাং পাড়ায়। এটি বমদের পাড়া। বেশ গোছানো এবং পরিচ্ছন্ন। সামনের দিকে চলতে থাকি। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। রামাদং জয়ের নেশায় দ্রুত পা চালাই। এক সময় বড় বেশি ক্লান্ত অনুভব করি। গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেই। পিপাসা লেগেছে খুব। কিন্তু কারো কাছে পানি নেই। আগন্তুক এক খুমী পরিবারের কাছে পানি চেয়ে পান করি।
আমরা চলতে থাকি। আরো কিছুদূর যেতে আশ্চর্য হয়ে দেখি, আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রামাদং পাহাড়। বিকেলের কোলে মাথা রেখেছে। আস্তে আস্তে নেমে আসছে সন্ধ্য। দেখতে রামাদং খুব কাছে লাগে। কিন্তু এর নিচে পৌঁছতে এখনও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। এবার নিচে নামতে শুরু করলাম। খাঁড়া পাহাড়। খুব সাবধানে নামতে হচ্ছে! ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছে যাই রনিনপাড়ায়। রামাদংয়ের নিচে মানুষের শেষ বসতি। এ পাড়ায় তংচঙ্গ্যা ও বমদের বসবাস। আমরা তংচঙ্গ্যা জয়ধর মেম্বরের বাড়িতে উঠি।
খাবারের আয়োজন চলছে। দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি। ক্ষুধায় বড় অস্থির লাগে। খাবার আসতেই খেয়ে দেয়ে ঘুম।
সকালে যে যার মতো ঘুরছে। ছবি তুলছে। কেউ আবার ঘুমোচ্ছে। রামাদং সকালের সূর্যের আলোয় হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। বড় সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য!  এখন ফিরে যাবার পালা।
সকালে খিচুড়ি খেয়ে রওয়ানা দিই। লাইন ধরে হাঁটি। বাঁশ আর বাঁশ। পরে মনরেম পাড়ায় বিশ্রাম নেই। কিছু খেয়ে নিয়ে আবার শুরু করি হাঁটা। আমরা সবাই ক্লান্ত। খাড়া এক একটা পাহাড়ের নিচে থেকে উপরে উঠতে উঠতে ভাবি, এটি পাড়ি দেবো কীভাবে?
এইভাবে মাইল খানেক হাঁটি। একসময় বড় আরাম লাগে। ঝিরির এক জায়গায় এসে দেখি, বিশাল বিশাল আকারের পাথর। এত বড় পাথর আগে কখনো দেখিনি। তারপর আবার হাঁটা। এবার একটি পাহাড়ি ছড়া পেয়ে যাই। শীতল জল। প্রাণভরে øান করে নিই। তারপর আবার হাঁটা। এক সময় নাগাল পেয়ে যাই রেংছড়ি বাজার। গাড়ি রিজার্ভ করে আসি বান্দরবান। এস. আলম-এ চেপে সোজা ঢাকা।

No comments:

Post a Comment